ইভলিন
জেমস জয়েস
জানালার ধারে বসে এভিনিউ এর বাড়ি আর সন্ধে হওয়া রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল ইভলিন। জানালার পরদায় হেলানো ওর মাথা। ধুলো জমা সুতি কাপড়ের ময়লা পরদা থেকে নাকে আসছিল ভারী গন্ধ। ও বড় ক্লান্ত, দুই একজন লোক ইভলিনের সামনে দিয়ে হেটে গেল। এভিনিউ এর শেষ বাড়ির মানুষটিও ওর দৃষ্টি অতিক্রম করে হেটে গেল। কংক্রিট এর রাস্তা থেকে ইভলিন তার জুতার খটখট শব্দ শুনতে পেল। তারপর খোয়া বিছানো পথের বুকে মচমচ শব্দ গিয়ে থামলো লাল রঙের নতুন বাড়িটার সামনে। এক সময় ওখানে ফাকা মাঠ ছিল, প্রতিদিন বিকেলে সেও পাড়ার অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলতো। তারপর বেলফাষ্ট এর এক লোক মাঠটি কিনে নিয়ে বাড়ি করল। সে বাড়ি তাদের বাড়ির মত ছোট রঙচটা বাড়ির মত নয়, ঝকঝকে বড় বাড়ি। পাড়ার সমস্ত ছেলে মেয়েরা একসাথে খেলতো ওই মাঠে। ডেভিন,০ ওয়াটার, পংু ছোট কিয়োঘ, সে ও তার ভাই বোনেরা। আরনেষ্ট অবশ্য খেলতনা অন্যদের তুলনায় সে অনেক বড় হয়ে গেছিল। ইভলিনের বাবা প্রায়ই তার কালো লিকলিকে ছড়ি হাতে মেরে তাদের মাঠ থেকে বের করে দিতেন। এ জন্য ছোট্ট কিয়োঘ পাহাড়ায় থাকতো এবং ছোট্ট কিয়োঘ বাবা আসলে চেঁচিয়ে বলে দিতো সবাইকে। তারপরেও সেইসব দিনগুলোকে কত সুখের বলে মনে হয়। তখন বাবার স্বভাব এত খারাপ ছিলনা তাছাড়া মা ও বেচে ছিলেন। অনেক দিনের কথা এইসব, এখন ইভলিন ও তার ভাইবোন গুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। মরে গেছে মা, টিজি ডান আর নেই,মরে গেছে সেও, ওয়াটাররা এখন ইংল্যান্ডে।সবকিছু বদলে গেছে, এখন ইভা নিজেই অন্যদের মত চলে যেতে চাচ্ছে আজন্ম। ঘরের চারদিকে একবার চোখ বোলায়,প্রতিটি জিনিস কত পরিচিত।
এসবের ধুলো সপ্তাহে একদিন ঝেড়েছে, মুছেছে আর অবাক হয়ে ভেবেছে এত ধুলো আসে কোথা থেকে? এসব জিনিস থেকে সে কখনো বিচ্ছিন্ন হতে পারে! এমন কথা ইভলিন স্বপ্নেও ভাবেনি। অথচ ও চলে গেলে এগুলোর সাথে কোনোদিন হয়তো দেখা হবেনা।
বাড়ি ছেড়ে ছেলেটার সাথে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইভা, কাজটা ঠিক বুদ্ধিমানের মত হছেতো? প্রশ্নটা চতুর্দিক চিন্তা ভাবনা করে সে নিতে চায়। যত যাই হোক বাড়িতে তার নিশ্চিত একটা আবাস আছে, খাবার আছে , সারাজীবন ধরে যাদের চেনে জানে তারাও আছে সেখানে। যদিও ঘরে বাইরে দুইদিকে ইভাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।আচ্ছা! সে একটা ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছে তখন দোকানের ওরা কি ভাববে? হয়তো বলবে মেয়েটা বোকা আর সাথে সাথে বিজ্ঞাপন দিয়ে ইভার শুন্য জায়গাটা পূরন করে নিবে। গেভান মেয়েটি হয়তো খুশিই হবে, বরাবর ই কতৃত্ব ফলাতো মেয়েটি ওর উপর। বিশেষ করে যখন খবরদারি দেখানোর মত লোকজন তার ধারে কাছে থাকতো। এইযে ইভলিন দেখছ না? ভদ্র মহিলা দাড়িয়ে আছেন! সব সময় হাসিখুশি থাকবে আর চটপট করে কথা বলবে বুঝলে? দোকান ছেড়ে চলে গেলে সেই সুদুর নিজের বাড়িতে এই বিশ্রি ব্যপার গুলো হয়তো আর ঘটবেনা। সেখানে তার বিয়ে হবে, তখন কথা বার্তা ব্যবহারে লোকজন তাকে সম্ভ্রম করে চলবে। সমস্ত জীবন তার মা বাবার কাছ থেকে যে ব্যবহার করেছে সেরকম ব্যবহার আর কেউ করবেনা। এখনো এই অতিক্রান্ত উনিষেও বাবার ব্যবহারে তাকে গুটিয়ে থাকতে হয়। অবশ্য হ্যারি আর আরনেষ্ট কে বাবা প্রায়ই মারলেও বাবা কখনো তার গায়ে হাত তুলেনি। সেতো মেয়ে তবুও সম্প্রতি বাবা তাকে শাষাতে শুরু করেছেন। ওর জন্য তিনি যা কিছু করেছেন কিংবা ভবিষ্যতে করবেন সব কিছু তার মায়ের কথা ভেবে। অথচ বাবাকে বাচানোর মত এখন কেউ নেই। আরনেষ্ট মরে গেছে,আর হ্যারি চার্লস সাজানোর কাজ নিয়ে তাকে কখন দূর দূরান্তে গিয়ে থাকতে হয়। তাছাড়া শনিবার রাত্রে টাকার জন্য বাবার সাথে অনিবার্য ঝগড়াঝাঁটি, খুব যন্ত্রনা দিচ্ছে আজকাল। সাপ্তাহিক মজুরির আগাগোড়া টাকা ও তুলে দিত বাবার হাতে, অন্যদিকে হ্যারিও কিছুই রাখেনা পকেটে। কিন্তু মুশকিল বাধে বাবার থেকে টাকা নেয়ার সময়। তার ধারনা ইভ্লিন বাজে খরচ করে অযথা পয়সা ওড়ায়,ওর মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধি নেই পথে ছড়ানোর জন্য এত টাকা পয়সা ওর বাবা ইভলিনকে দিতে পারবেনা। এরকম হাজারো গালমন্দ। শনিবার রাতে তার বাবা এমনি অমানুষ হয়ে উঠেন। শেষমেষ ওকে টাকা দিয়ে বলেন রোববার খাবার কিনবে কি না। ক্ষোভে উত্তেজনায় ইভলিন তখন বেড়িয়ে যায়। অকে কনুই দিয়ে পথের ভিড় ঠেলে পথ তৈরি করে এগোতে হয়। আর একরাশ বাজারের ভাড় নিয়ে ফিরতে বেলা পরে যায়। এছাড়া বাড়িকে গোছগাছ রাখতে ওকে দিতে হয় নিদারুণ শ্রম। এর পরেও আছে দুটো বাচ্চার দেখাশোনার ভার। প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছে কি না, সময় মত খাবার খাচ্ছে কিনা দেখতে হয় তাকে। কাজগুলো অত্যন্ত কষ্টের জীবনটা নিতান্তই কঠিন। তবুও চলে যাওয়ার শেষ মূহূর্তে এই জীবনটার প্রতি একটা টান অনুভব করছে ইভলিন।
পরিপূর্ণ একটি নতুন জীবনের সন্ধানে ফ্রাঙ্ক এর সাথে নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে ইভা। বড় মমতা ওর বুকে, যেমন পুরুষ দিপ্ত চেহারা,তেমনি উদর ওর হৃদয়টাও। রাতের জাহাজে ও চলে যাবে ফ্রাঙ্ক এর সাথে সুদূর । সেখানে ফ্রাঙ্ক এর একটা বাড়ি আছে। তার সাথে যেদিন প্রথম দেখা হলো সেদিনটার স্মৃতি কত স্পষ্ট তার মনে আছে। ফ্রাঙ্ক তখন এভিনিউ এর একটা বাড়িতে ভাড়া থাকতো। ইভলিন সেখানে গিয়ে দেখা করতো প্রায়ই। এখন মনে হয় এইতো সেদিনের ব্যপার সব। সূচালো টুপিটা পিছনে ফেলে দিয়ে ফ্রাঙ্ক এসে দাঁড়িয়েছিল গেটের সামনে, তার রোধ ঝলসানো কালো মুখটার উপর এসে পরেছিল অবাধ্য একগোছা কালো চুল। তারপর তারা ধীরে ধীরে আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে, চিনেছে পরস্পরকে।
ফ্রাঙ্ক ওর সাথে দেখা করতো এক দোকানে প্রতি সন্ধ্যায়। মাঝে মাঝে বাড়িতেও আসতো। একদিন ভবঘুরে ছবিটি দেখানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিল ইভলিনকে। থিয়েটার হলের এক কোনে, আলো আধারের রোমাঞ্চিত সেই পরিবেশে ফ্রাঙ্ক এর পাশে বসে ছবি দেখার সময় ইভলিন অনুভব করেছিল কেমন সুখকর চঞ্চল অনুভুতি। ফ্রাঙ্ক গানের পাগল তাকে প্রায় ই গান শোনাতো।পরিচিতরা জানতো ওদের ইংগেজমেন্ট হয়ে গেছে। আর ফ্রাঙ্ক যখন ই সেই গানটা গাইতো যে গানে এক নাবিকের প্রেমে মত্ত তরুনীর কথা রয়েছে, অদ্ভুত এক পুলকে ভরে উঠতো ইভার মন। ফ্রাঙ্ক এর মত এক তরুনকে জীবনে পেয়ে সে উত্তেজনায় বিভোর হয়ে উঠেছিল।তারপর ইভলিন তাকে ভালবেসে ফেলে। ফ্রাঙ্ক তাকে তখন দূর দেশের জাহাজের গল্প শোনাতো। কানাডা গামী এক জাহাজে মাসিক এক পাউন্ডে ডেক বয় হিসেবে কাজ শুরু করে সে।তারপর একে একে বিভিন্ন জাহাজে কাজ নিয়েছে ফ্রাঙ্ক এবং কত রকমের যে কাজ করতে হয়েছে! ফ্রাঙ্ক একে একে সেই জাহাজের নাম বলতো এবং কি কি কাজ করতে হতো তাও বলতো ইভলিনকে। জাহাজে করে ওকে পার হতে হয়েছিল ম্যাগেলান প্রনালী।সে মানুষ খেকো প্যাটালিয়নদের গল্প, একবার ও বলেছিল কিভাবে এক দিনের ছুটি মঞ্জুর করে দেশের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। ছুটি আদায় করতে ফ্রাঙ্ক কে পায়ে ধরে মিনতি করতে হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত কিছুদিন আগে ইভলিনের বাবা তাদের সম্পর্ক এর কথা জেনেছে।ফ্রাঙ্ক এর সাথে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। এসব নাবিক ছোকরাদের আমার চেনা আছে। একদিন ফ্রাঙ্ক এর সাথে ঝগড়া বাধিয়ে ফেললেন সেই থেকে ইভলিন গোপনে দেখা করেন। সন্ধার অন্ধকার এভিনিউ তে আরো ঘন হয়ে আসে, তার কোলে ভাই ও বাবাকে লেখা চিরকুট দুটি পরে আছে। চিঠির উপরের সাদা অংশ গুলো এখন অন্ধকারে অস্পষ্ট। আরনেষ্ট ইভলিনের খুব প্রিয়, হ্যারিকেও কম ভাল বাসেনা! বাবা বেশ বুড়িয়ে গেছেন এবার তিনি ইভলিনকেও হারাবেন।মাঝে মাঝে বাবা খুব ভালো মানুষ হয়ে ওঠেন। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ইভলিনের যখন খুব জ্বর আসতো তিনি ওকে ভূতের গল্প পড়ে শোনাতেন আর আগুনে পাওরুটি সেকে দিতেন। আর একদিন ওরা যখন সবাই মিলে বনভোজনে গিয়েছিল তখন তার বাবা হাসানোর জন্য মায়ের বনটা মাথায় পরে মেয়েদের মত ঢং করেছিলেন। দ্রুত সময় বয়ে গেলেও ইভা একি ভাবে জানালার পর্দায় মাথা ঠেকে রাখে। ধুলো জরানো ময়লা পর্দা থেকে ওর নাকে আসে ভারী গন্ধ। অকস্মাৎ এভিনিউ এর দূর প্রান্ত থেকে ওর কানে আসে শব্দ, কত পরিচিত এই সুর। কি আশ্চর্য এই ভর সন্ধায় এই সূর মনে করিয়ে দেয় মায়ের কাছে তার প্রতিজ্ঞার কথা। যতদিন সম্ভব এই পরিবারকে একসাথে রাখার প্রতিজ্ঞার কথা। মনে পরে মায়ের অসুস্থতার শেষ রাত্রির কথাও, সে রাত্রি ইভলিন শুয়েছিল অন্ধকার হল ঘরে। বাইরে থেকে ভেসে আসছিল ইতালীয় বিষন্ন সুর।ছয়টা পয়সা অর্গান বাদককে দিয়ে চলে যেতে বলা হয়েছিল। বাবা মুমূর্ষু মায়ের রুমে ঢোকার সময় বিড়বিড় করছিলেন হতচ্ছাড়া ইতালিয়ান গুলো এখানে এসেও জুটেছে। যখন ই মায়ের অসুস্থ চেহারা ভেসে উঠে বেদনায় ভরে যায় ইভলিনের হৃদয়টা। তার সেই সহজ আত্নত্যাগ কিভাবে নিঃশেষ হয়ে আসছে। ভয়ে ইভলিন কেপে উঠে বারবার তার মনে পরে মায়ের বিরামহীন প্রার্থনা। দয়া কর মা মেরী, দয়াময়ী মেরী! আকস্মিক এক তাড়নায় ইভলিন লাফিয়ে উঠে, পালাতে হবে, এসব ছেড়ে তাকে পালাতেই হবে।হয়তো ফ্রাঙ্ক তাকে বাঁচাতে পারবে নতুন জীবনের সাথে হয়তো ভালবাসাও দেবে।সেতো বাচতেই চায় অসুখী বা সে থাকবেই কেন। তারো অধিকার আছে সুখী হওয়ার, ফ্রাঙ্ক তার সবল বাহু বন্ধনে তাকে ধরে রাখবে, ধরে রাখবে দুহাতের বিপুল ক্ষমতায়। সেই পারবে তাকে বাঁচাতে।
নর্থওয়েলের বন্দরে ভীড়ের মধ্যে দাড়িয়েছিল ইভলিন।ওর হাত ধরেছিল ফ্রাঙ্ক, বুঝতে পারছিল ফ্রাঙ্ক ওকে বারবার কি বলছে।বলছে ওদের সুদূর যাত্রা পথের নানান কথা।সারা বন্দর জুড়ে বাদামী রঙের ড্রেস পরা সৈন্যরা গিজগিজ করছিল।জেটির গা ঘেসে দাঁড়িয়ে আছে জাহাজটা।ইভা কোনো কথার ই জবাব দিচ্ছিলনা, তার মুখ ক্রমশ হিম হয়ে আসছিল। তীব্র মানষিক যন্ত্রনায় ইভলিন কেবল প্রার্থনা করছিল এ অনির্ণীয় সংকটে পথ দেখাবার জন্য। তার করনীয় কর্তব্য নির্ধারণ করে দেয়ার জন্যে।এক সময় জাহাজটা কুয়াশার আবরন ছিন্ন করে দীর্ঘ বেদনার্ত শব্দে ভো দিয়ে উঠল।যদি চলে যায় তো আগামিকাল ইভলিন থাকবে তার অপরিচিত পথে। ইভলিন কি এখন ফ্রাঙ্ক কে ছেড়ে চলে যাবে! এক যন্ত্রনায় সে আতকে ওঠে। তীড়তীড় করে কাপতে থাকে তার ঠোটজোরা। ভয়াবহ শব্দে তার হৃদয় যেন বিচূর্ণ হতে থাকে। অনুভব করে ফ্রাঙ্ক তাকে ডাকছে এসো! পৃথিবীর সাতটি সমূদ্র যেন ওর একটুখানি বুকের ভেতর তোলপার শুরু করে।আর ফ্রাঙ্ক যেন সেই গর্জনশীল বিক্ষিপ্ত সমূদ্রের মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যেন উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ডুবিয়ে মারবে তাকে।ইভলিন দুই হাতেরর প্রচন্ড শক্তি দিয়ে আকড়ে ধরে লোহার রেলিং।এস! না না না! কি করে? অসম্ভব! উন্মাদ এর মত ও দুহাতে রেলিং চেপে ধরে, অন্তহীন সমূদ্রের দিকে তাকিয়ে যন্ত্রনায় কুকিয়ে ওঠে ও। ভীড়ের ধস্তাধস্তির মধ্যে ফ্রাঙ্ক কোনোরকম ওপারে গিয়ে আসতে বলে ওকে। ব্যস্ত যাত্রীরা ফ্রাঙ্ক কে এগিয়ে যেতে চিৎকার করে ওঠে।তবুও ফ্রাঙ্ক ডেকেই যায়। অবিকল অসহায় জন্তুর মতন ইভলিন ফ্যাকাশে মুখটা ফ্রাঙ্ক এর দিকে তুলে ধরে।তার সেই দৃষ্টিতে না প্রেম না বিদায়! ফ্রাঙ্ক খুজে পেলনা কোনোটাই।


0 মন্তব্যসমূহ